নতুন জায়গায় খারাপ সবকিছুকে তুচ্ছ করে এগিয়ে যাওয়ার শুরু, নতুন জব, উঁচু অবস্থান সত্যিই নিজেকে খুশির আঁচ পেতে দেখছি পূনরায় যেন ।
কাজটায় জয়েন করার পরে পরেই,
বাইক কেনার জন্যে লোন নিই আর পুরানো বাইকের খোঁজ করা শুরু করি ততদিনে জামাইবাবুর গ্ল্যামার বাইক টা নিয়েই অফিস যাওয়া আসা শুরু করি ।
ঘটনা টা হলো ১১ অক্টোবর ২০২০ এর, রবিবার অফিস ছুটির দিন এক বন্ধুর সাথে ঘুরতে যাবার প্ল্যান ছিল প্রথমত রাজী ছিলামনা কারণ সেদিনও অফিস খোলা থাকার কথা ছিল কিন্তু পরে অফিস যাওয়া ক্যান্সেল হলে রাজী হতেই হয় ।
সেদিন সকালে তিনজন বন্ধু (স্কুল ফ্রেন্ডস) একসাথে হই নানান গল্প গুজব মজা ঠাট্টা সব কিছুই ছিল সাথে ছিল গাড়ি এক্সচেঞ্জ করার কথা সে (স্কুটির মালিক) নিজেই বলে যেহেতু তোরা বাইরে যাবি তো আমার স্কুটি টা নিতে পরিস গাড়ীর কাগজ সব OK আছে পুলিশ ধরলে কোনো ভয় থাকবেনা আর আমারও বাইক চালানো ট্রেনিংও হয়ে যাবে যেহেতু সে কয়েকদিন আগেই বাইকের ট্রাইলে ফেল করেছে ।
আমরা দুজন বন্ধু আর তিনজন মেয়ে যাদের একজন নাকি আমাদের একই কলেজে (শিলিগুড়ি কলেজ) পড়ত আর বাকিরা ওরই বোন ছিল কিন্তু আমি চিনতাম না আমার বন্ধুর বান্ধবী বলেই চেনা জানা হয় ।
প্রথমে লালপুল যাই সেখানে সেদিন পুলিশ রেড পরে বলে সেখান থেকে বেরিয়ে দুধিয়ার দিকে রওনা দিই আমি তখনও বললাম একটা জায়গা কতবার যাবি অন্যদিকে যাই ?
কিন্তু না আসলে ফেরার পথে একটা বড়ো ঘটনা হবারই ছিল সেদিন আর ঠিক সেটাই হলো মেয়েটা আমার থেকে স্কুটি চাইলো আর আমিও না জেনে বুঝে দিয়েও দিই রাস্তা প্রায় শেষের দিকে গিয়ে একটা ইলেকট্রিক পোস্টে ধাক্কা মারে আমি ছিটকে রাস্তায় আর মেয়েটা বেহুস অবস্থায় পড়ে আছে স্কুটি টায় হেলান দিয়ে, গাড়িটার দিকে তাকালাম সব কিছু তছনছ পরে আছে, কিন্তু রক্ত গুল সব কিছুই আরও জটিল করে দিল আমার সমস্ত ভাবনা চিন্তা আর সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা সব কিছু থমকে দাঁড়ায়, চোখের দেখা সব কিছুই ঝাপসা তখন, ফোনের স্ক্রিনে রক্তের দাগ, রুমালে, হাতে, পায়ে কিন্তু অন্য বন্ধুটা আর ওর সাথে থাকা দুজন যেহেতু আমাদের থেকে এগিয়ে ছিল ওর পেট্রোল শেষের দিকে বলে তাই ওকে ফোন করে ডাকা আর মেয়েটাকে হসপিটাল এ নিয়ে গিয়ে জীবন বাঁচানো টা আমার কাছে ভীষন ইম্পর্ট্যান্ট মনে হয় আর অবশেষে সব কিছুই একপ্রকার স্বাভাবিক মনে হয় অন্তত প্রাণে রক্ষা পাই বলে ।
আর হ্যাঁ রাস্তায় রক্তাক্ত শরীর নিয়ে পরে থাকলেও যে কেউ সাহয্যের হাত বাড়ায় না এবং গাড়ি পরিষ্কার করা নোংরা একটা কাপড় দেয় রক্ত মোছার জন্য সেদিনের অভিজ্ঞ্যতা টা মনে রাখার মতো মানুষের এটাই ছিল সেরা মানসিকতার পরিচয় আমার চোখে ।
তারপরের দিন স্কুটি টা নিতে থানায় যাওয়া এবং নিজের বাইকটা বন্ধুর কাছে রেখে দেওয়া আর নিজের হাঁটতে না পারা পা নিয়েই এসব কিছু নিজের কর্তব্যের বলে সেসব পূরণ করা এবং বাইক চালাতে না পারলেও বাইক চালিয়ে নিয়ে যাওয়া এরপর প্রায় দুই সপ্তাহ পরে নিজেকে স্বাভাবিক মনে হলে অফিস জয়েন করি পুণরায়, তখনও আমার বন্ধু ফোন করে জিজ্ঞেস করেনি কেমন আছিস বলে ।
প্রথম ফোনটা টা যখন আসল আশা করিনি যে ও টাকা চাইতেই ফোন টা করবে যদিও আগে থেকে আমি নিজে স্বীকার করেই নিয়েছি এবং কথা দিই যে গাড়িটার সমস্ত খরচ আমিই দিব আর নাকচ করার কোনো রাস্তাও নেই যেহেতু আমার দায়িত্ব ছিল গাড়িটার খেয়াল রাখা অতএব আমি না করতে পারিনি কিন্তু না বললেও বলতে পারতাম যেটা করিনি বরং সেইদিনই আমার এটিএম কার্ড টা ওকে দিয়ে দিই এবং মেয়েটাকে নিয়ে মেডিক্যাল পৌঁছাই, নিজের কাছে তখন শুধু 150 টাকার মতো থাকা সত্বেও কার্ড টা ওকে দিয়ে দিতে দুবার ভাবিনি যদি কোনো সত্যিকারের বন্ধু সেখানে থাকতো আমি নিশ্চিত সে কার্ড নিতে নাকচ করতো যেটা অনেক পরে উপলব্ধি করলাম ।
তারপর আমার কার্ড থেকে প্রথমে ৩০০০/- টাকা, তারপর ২৫০০/- টাকা বের হয় স্কুটিটার প্রাথমিক খরচ বাবদ ।
আমি নিজে ইন্সুরেন্স কোম্পানী তে ইমেইল করি ওরা ফোন করে গাড়ি সার্ভেও করে যায় তারপর গাড়ি ঠিক হলে ইন্সুরেন্স কোম্পানী থেকে ফোন আসলেও তাকে ভুলভাল তথ্য, ফটো দিয়ে সহায়তা না করা আমাকে না জানান, যেহেতু ইন্সুরেন্স টা পেলে আমার সাহায্য হতো টাকা গুলো আমার বেঁচে যেত ।
আচ্ছা নিজের গাড়ি অ্যাকসিডেন্ট হলে নিজের ইন্সুরেন্স টাও কি ক্লাইম করা যায়না নিজে থেকে বা কে চায়না যে ধুর ছার না পেলেও কোনো যায় আসেনা, বন্ধুত্বের দায় টা না দিলেও এটুকু তো করা যায় নাকি অন্তত গাড়ীর মালিক হিসেবে ?
হতে পারে তাহলে আমার বন্ধুর একটু মূল্যবান ভাবনা রয়েছে বলাই যায় ।
তারপর আবার ফোনের ওপার থেকে আওয়াজ আসে কিরে টাকা যোগাড় করলি ?
আমার উত্তর ছিল না এখন কোথায় পাবো স্যালারি টা ঢুকলেই দিয়ে দিব আপাতত তোর টাকা খরচ করতে থাক যত হবে আমি দিয়ে দিব ।
জিজ্ঞেস করি যেহেতু স্কুটি টা বিক্রি করে দিবি সেই টাকায় আপাতত কাজ চালা কিন্তু উত্তর আসে "সেটা আমার পার্সোনাল ব্যাপার আমি গাড়ি বিক্রি করবো না কি করবো সেটা নিয়ে তোকে ভাবতে হবেনা তুই টাকা কবে দিবি সেটা বল"
আমি চুপ হয়ে যাই আর সেদিনের মত কথা শেষ হয় আমি কাজে মন বসাতে শুরু করি ততদিনে আরেকবার সেই ফোনটাই আসে শুধু টাকার খোঁজ নিতে আরও বলে যে লোনের টাকা টা দিতে পারিস স্যালারি পেলে মিলিয়ে নিস কিন্তু আমি বাড়িতে এত টাকা নষ্ট করার কথা না বলার সিদ্ধান্ত রাখি যেটা আজও মনে হয়না ভুল করেছি কিন্তু ওর সব বুঝেও এমন কথা গুলো শুনে ভীষন খারাপ লাগলে আমার অন্য এক বন্ধুর থেকে ধার করে আবার ৪ হাজার টাকা দিই কিন্তু গাড়ি টা ঠিক করতে টোটাল ২২ হাজার খরচ হয় যা আমার কাছে একান্তই আমার নিজের খরচ বাড়ি তে বলাটা সহজ ছিলইনা তাই একমাত্র উপায় ছিল স্যালারি কিন্তু এই পরিমাণ টাকা আমার একমাসের টাকায় পূরণ হয়না অতএব মন না চাইলেও বলতে হয় যে বাকি টাকাটা আগের মাসে নিস আমার মাসিক আয়ের পুরোটা দিলেও অবুঝের মতো টাকা যোগাড় করার চাপ দেওয়া টাই তাহলে বন্ধুত্বের পাওনা ?
যদিও আমি আমার হাত খরচ টা অব্দি রাখতে ভুলে যাই এবং মাসের অর্ধেক যেতেই চারিদিক থেকে আর্থিক ভাবে প্রায় শূন্য হয়ে পরি কাউকে বলতেও পারিনি তবে বন্ধু দের একজনই তখন হাত বাড়িয়েছিল।
তারপরেও অকথা কুকথা গুলোর শুরু হয় এর পর থেকেই একদিকে কেউ বলে তোর জন্য আমি গাড়ি নিয়ে পুজোয় ঘুরতে পারলাম না কাজে যেতে পারলাম না কত টাকা লজ করলি তুই জানিস? বন্ধুটার মা অব্দি ফোন করে বলে বাবু নিজের ভুলের জন্য তো এখন তোকেই তার দাম দিতে হবে তাইনা সেদিন কিছু বলিনি কিন্তু কে এমন ভাবে বলে শুনি ??
অ্যাকসিডেন্ট টা তবে কি আমি নিজের ইচ্ছায় করেছি মানুষ বলে বন্ধু চেনা যায় বিপদে তো এটা কি আমার বানানো নাটক ছিল নাকি ?
আর অ্যাকসিডেন্ট টা আমি না বরং মেয়েটা করেছিল
পরে যেটা জানতে পারি যে ও ঠিকঠাক গাড়ি চালাতে পারতোনা আর আমার প্রশ্ন একটাই ছিল যে গাড়ি যেহেতু চালাতে পারেনা তো বলা উচিত তাই না ?
কিন্তু বলেনি আর আমার দোষ যে আমি বিশ্বাস করি অন্ধের মত আর গাড়ি টা দিয়ে দিই
হেলমেট পড়তে বললেও সেটা করেনি কিন্তু তারপরেও আমি ওকে সোজাসুজি ভাবে দোষ দিই নি কারন সে হয়তো আবার এসব নিয়ে ভাবতে থাকবে যেটা কতটা খারাপ আমি অন্তত অল্প হলেও বুঝি এই খারাপ দুঃস্বপ্ন গুলো কতটা যন্ত্রণা দেয় কিন্তু অন্যদিকে আমার প্রীয় বন্ধু এসবের জন্যে সোজাসুজি আমার দিকে আঙুল তুলে ধরলো এটাই তো ঠিক তাইনা ??
বন্ধুত্বের পাওনা বলে কথা এমন দামী না হলে হয় ?
ও হ্যাঁ আরও বাকি আছে আমার প্রীয় বন্ধুর বলা কিছু মূল্যবান বক্তব্য যেগুলো না বললেই নয় 👇
১, "আমি চাইলে তোর বাইক টা আটকে দিতে পারতাম "
২, "যদি মেয়েটা মারা যেত তাহলে আমি স্কুটি চুরির কেস করতাম "
∆ অর্থাৎ নিজের বন্ধুকে চোর সাজাতেও পিছুপা হতনা, সত্যিই দারুন ।
৩, "তোর তো কিছুই হয়নি যা ক্ষতি হলো আমার হলো "
∆ তোর স্কুটি টা না নিলে এমন দুর্ঘটনা হতই না অর্থাৎ দোষারোপ টা আমিও করতে পারি ।
৪, "আমি নাকি ওদের বাড়ি যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছি টাকার ভয়ে"
∆ আরে দাদা কোনোদিন তোদের বাড়ি গেছি বিনা দরকারে খাবার খেতে আর এমন হাটতে না পারা অবস্থায় তোদের বাড়ি যেতাম মজা করতে তাইত ?
৫, "আমি ওর বন্ধু বলেই নাকি আমার বাইক টা আটকে রাখেনি এবং আমার সাথে খুব ভালো ব্যাবহার করছে"
∆ হ্যাঁ এর জন্য ধন্যবাদ আপনাকে ।
আরও আছে যেগুলো আপাতত মনে পরছেনা,
এরপর অবশেষে সমস্ত টাকার হিসেব বুঝিয়ে দিয়ে আমি চুপ থাকি ।
এবং এই ঘটনা টার থেকে নিজেকে মুক্ত করার চেষ্টা করতে শুরু করি এভাবে এমন খারাপ ভাবে নিজেকে ডুবতে দেখে ভীষন খারাপ গুমট হয়ে থাকি তারপর ধীরে ধীরে সব কিছু নরমাল মনে হয়।
কিন্তু কিছু মিথ্যে সমালোচনা তাও এই খারাপ ঘটনার ব্যাপারে আমাকে আমার পুরোনো ডায়েরির লেখা গুলো তুলে ধরতে বাধ্য করলো তাই না বলে পারলাম না ।
একদিকে কিছু অপ্রাপ্তির বেদনা থেকে নিজেকে ঠিক ভাবে সরিয়ে রাখতে না পারা আমি তার উপরন্তু এই রকম একটা খারাপ ব্যাপার আমার হয়তো প্রাণ কারেনি কিন্তু মানসিক ভাবে নিশ্চুপ করে দিয়েছে,
এর থেকেই আরেও একটা সম্পর্কের ইতি ।।
অবশেষে বলব এসব খারাপ দুঃস্বপ্ন গুলো নিয়ে দয়া করে মিথ্যে গল্প গুজব মজা করা বন্ধ রাখিস পারলে সে যেই হোক যারা যারা আজকের আগে থেকেই জানতিস তাদেরকেই বলছি ।
বি দ্রঃ- সম্পূর্ণ সত্যি ঘটে যাওয়া আমার জীবনের একটা দুঃস্বপ্ন কাহিনী ।
No comments:
Post a Comment